খালেদা-হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি
- আপডেট : ০৯:৫৭:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৩৫২ বার দেখা হয়েছে
কখনও রাজনীতি করেননি। কিন্তু খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম ।
ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে মানুষের ভিড়ে কথা হয় ৬৮ বছর বয়সী এই মি.ইসলামের সঙ্গে।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ পর্যায়ে কারাবন্দি থাকা এবং দীর্ঘ সময়ের অসুস্থতার কারণে তার প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল মি. ইসলামের। সেকারণে বিএনপি নেত্রীর জানাজায় শরিক হন বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশে দলমত নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে খালেদা জিয়ার জানাজা ইতিহাস গড়ল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তারা বলছেন, স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর কারণে আকস্মিকভাবে রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। এরপর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ‘আপসহীন’ পরিচিতি পেয়ে একটা প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন।
বিজ্ঞাপন
খালেদা জিয়ার চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে লম্বা সময় ধরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন এই দুই নেত্রী; তাদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত ছিল রাজনীতি। তারাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে খালেদা জিয়া বিদায় নিলেন রাজনীতির মঞ্চ থেকে। অন্যদিকে, প্রায় দেড় বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং সেখানেই অবস্থান করছেন।
এখন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।
প্রভাবশালী এই রাজনীতিক রেখে গেলেন সেই দল বিএনপি, যে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর ধরে।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থান ঠেকেছিল বৈরি সম্পর্কে। তাদের মুখোমুখি অবস্থানের রাজনীতি চলেছে দশকের পর দশক।
বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ বলে চিত্রিত করেছে।
দুই নেত্রীই গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাদের দুজনের শাসনামলেই মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কমবেশি অভিযোগ, সমালোচনা রয়েছে।
২০০১ সালে খালেদা জিয়ার পূর্ণ মেয়াদের দ্বিতীয় দফার সরকার গঠনের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের অনেক অভিযোগ উঠেছিল।
সেই সরকারের এক বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০০২ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে সেনাবাহিনীকে দিয়ে অপরেশন ক্লিনহার্ট নামে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান চালানো হয়েছিল।
৮৪ দিনের এই অভিযানে আটকের পর অন্তত চল্লিশ জনের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। অভিযান শেষে অধ্যাদেশ জারি করে দায়মুক্তিও দেওয়া হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সোচ্চার হয়েছিল এবং সমালোচনার মুখে পড়েছিল সরকার।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের ওই সরকারের সময়ই পুলিশের বিশেষ বাহিনী র্যাব গঠন করা হয়েছিল। র্যাবের হাতেও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক অভিযোগ উঠেছিল।
তবে এর সঙ্গে তুলনা করলে শেখ হাসিনার সর্বশেষ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানুষের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ পর্যায় থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা মামলার ভারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। গ্রেফতার আতঙ্কতো ছিলই। তাদের জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রেও সরকারের বাধা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন,আওয়ামী লীগের ওই শাসনে বিরোধী মতও দমন করা হয়েছে কঠোরভাবে। ব্যক্তিগভাবে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করলেও তার ওপর সরকারের খড়গ নেমে আসতো।
দমন নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেখ হাসিনার টানা শাসনে প্রতিহিংসার রাজনীতির চূড়ান্ত একটা অবস্থা দৃশ্যমান হয়েছিল। এক পর্যায়ে খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দুই বছর কারাবন্দী করে রাখা হয়েছিল।
টানা ক্ষমতায় থাকার চিন্তা থেকে পর পর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করে নির্বাচনী ব্যবস্থাই ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার জনবিচ্ছীন্ন হয়ে পড়েছিল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তারা বলছেন, এসব কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল এবং গণ-অভ্যত্থানে পতন হয়েছে শেখ হাসিনার শাসনের।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, খালেদা জিয়ার স্বল্পভাষী হওয়া, সহনশীল আচরণ দেখানোর বিষয় ছিল, যে কারণে রাজনীতিতে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার একটা ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছিল। আর সেকারণে তিনি একটা ‘স্বতন্ত্র’ রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে কখনো হারেননি তিনি।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দ্বি-দলীয় বা দুই দলের রাজনীতির জায়গায় পরিবর্তনের কথা আলোচনায় এসেছিল। জোর আলোচনা ছিল নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নিয়ে।
কিন্তু সেই আলোচনা থমকে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। তাদের মতে, দ্বি-দলীয় রাজনীতির সেই ধারাই দেখা যাচ্ছে।
সেখানে পরিবর্তন এটাই হয়েছে যে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে তাদের পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী। বারই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতকে ঘিরে অন্য দলগুলো আসন সমঝোতায় দুই ধারায় বিভক্ত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের শাসনের পতনে রাজনীতিতে এসেছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। এরই মাঝে খালেদা জিয়ার মৃতুতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু দ্বি-দলীয় রাজনীতির ধারা থেকে বেরিয়ে আসা কতটা সম্ভব হবে, সে প্রশ্নে সন্দেহ রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।















