১০:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ ও ঐক্যের বন্ধন গড়ার আহ্বান অধ্যাপক আ ফ ম রাজিবুল আলম ইভানের

অন্যদেশ ডেস্ক
  • আপডেট : ০৮:২১:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২২০ বার দেখা হয়েছে

উন্নত বিশ্বের আদলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চিরতরে বর্জন করে প্রকৃত ছাত্ররাজনীতি এবং ইতিবাচক ‘ব্রাদারহুড’ বা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন নগরবাসী ফোরাম ঈশ্বরদীর আহবায়ক এবং ঈশ্বরদী বইমেলার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আ ফ ম রাজিবুল আলম ইভান।

​সম্প্রতি শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চিত্র, দলীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব এবং বুয়েটের সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি এই আহ্বান জানান।

​নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, একটি স্বাধীন দেশের উন্নয়নের প্রথম শর্ত মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা। অথচ আমাদের দেশে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও শিক্ষার মান ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ জ্ঞানচর্চার চেয়ে রাজনীতির প্রধান মাঠে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব তো বটেই, এশিয়ার সেরা র‍্যাংকিংয়েও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

​এর মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দেশের নীতিনির্ধারক ও আমলাদের অধিকাংশই এবং তাদের পরিবার বিদেশে পড়াশোনা ও বসবাস করেন। দেশের অর্থ পাচার করে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও তাদের কিছু আসে-যাওয়া যায় না। উল্টো দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি টিকিয়ে রেখে টেন্ডারবাজি, দখলদারি ও ভিন্নমতের ওপর দমনপীড়ন চালাতে তাদের সুবিধা হয়।

​দলের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি হলের স্বাভাবিক পরিবেশকে কীভাবে গ্রাস করে, তার একটি বিশদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে নিবন্ধটিতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ​সিট বাণিজ্য ও জোরপূর্বক মিছিল: হলের সিট দখল ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক মিছিলে অংশ নিতে বাধ্য করা।
  • ​সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা: বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ, নিয়মিত চিৎকার-চেঁচামেচি, রাজনৈতিক আড্ডা, অস্ত্র ও মাদকের ছড়াছড়ি এবং পড়াশোনার পরিবেশ ধ্বংস হওয়া।
  • ​নিপীড়ন ও গেস্টরুম সংস্কৃতি: গেস্টরুমে র‍্যাগিং, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, বাড়িতে থেকে পাঠানো খাবারের ভাগ নেওয়া এবং নেতার অনুমতি ছাড়া চলাফেরা করতে না দেওয়া।
  • ​প্রশাসনের জিম্মি দশা: ডাইনিং ও ক্যান্টিন নিয়ন্ত্রণ এবং হলের প্রভোস্ট ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাখা। সামান্য নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে শারীরিক নির্যাতন বা জীবননাশের হুমকি দেওয়া।

​শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে দলীয় ছাত্রনেতারা ক্ষমতার যে অপব্যবহার করেন, তার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে এভাবে—

  • ​বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে প্রভাব বিস্তার।
  • ​বিভিন্ন টেন্ডার, সাপ্লাই, ছাত্র ভর্তি এবং গবেষণা ও স্কলারশিপ নিয়ন্ত্রণ।
  • ​শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে ক্যাম্পাসগুলোতে হানাহানি, সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির মতো ঘটনা।

​বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে নিবন্ধে বলা হয়, বহু রক্ত ও সংগ্রামের পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রশাসনকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য করেছে। তৎকালীন শাসকদল, তাদের ছাত্রসংগঠন এবং আজ্ঞাবহ মহলের নানা চাপ ও পরীক্ষা বন্ধের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা পিছু হটেনি। ফলস্বরূপ, বর্তমানে বুয়েটের হলগুলোতে কোনো দলীয় রাজনীতি নেই, রয়েছে শুধু নিরাপদ ‘ব্রাদারহুড’ বা পারস্পরিক সৌহার্দ্য।

​বুয়েটের একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা উদ্ধৃত করে রাজনীতিমুক্ত হলের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:

  • ​সহজে সিট প্রাপ্তি: কোনো তদবির বা রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়াই সাধারণ প্রক্রিয়ায় হলের সিট বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে।
  • ​র‍্যাগিংয়ের পরিবর্তে স্নেহের পরশ: জুনিয়রদের ওপর কোনো নির্যাতন নেই; বরং সিনিয়ররা নিয়মিত তাদের পড়াশোনা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ নিচ্ছেন।
  • ​নিরাপদ ও আন্তরিক পরিবেশ: ডাইনিংয়ে পরিচিত হওয়া, ছোটখাটো উপহার দেওয়া-নেওয়া এবং অসুস্থ রুমমেটদের নিঃস্বার্থ সেবাযত্নের মাধ্যমে হলগুলো এখন শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সুন্দর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।

​

অধ্যাপক আ ফ ম রাজিবুল আলম ইভান তার নিবন্ধের শেষাংশে বলেন, হীনস্বার্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের লীলা খেলায় মেতে না তুলে আসুন আমরা সকলে মিলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চিরতরে বন্ধের বিষয়ে সোচ্চার হই। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার না হয়ে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়—এটাই জাতির মূল প্রত্যাশা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ ও ঐক্যের বন্ধন গড়ার আহ্বান অধ্যাপক আ ফ ম রাজিবুল আলম ইভানের

আপডেট : ০৮:২১:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

উন্নত বিশ্বের আদলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চিরতরে বর্জন করে প্রকৃত ছাত্ররাজনীতি এবং ইতিবাচক ‘ব্রাদারহুড’ বা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন নগরবাসী ফোরাম ঈশ্বরদীর আহবায়ক এবং ঈশ্বরদী বইমেলার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আ ফ ম রাজিবুল আলম ইভান।

​সম্প্রতি শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চিত্র, দলীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব এবং বুয়েটের সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি এই আহ্বান জানান।

​নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, একটি স্বাধীন দেশের উন্নয়নের প্রথম শর্ত মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা। অথচ আমাদের দেশে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও শিক্ষার মান ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ জ্ঞানচর্চার চেয়ে রাজনীতির প্রধান মাঠে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব তো বটেই, এশিয়ার সেরা র‍্যাংকিংয়েও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

​এর মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দেশের নীতিনির্ধারক ও আমলাদের অধিকাংশই এবং তাদের পরিবার বিদেশে পড়াশোনা ও বসবাস করেন। দেশের অর্থ পাচার করে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও তাদের কিছু আসে-যাওয়া যায় না। উল্টো দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি টিকিয়ে রেখে টেন্ডারবাজি, দখলদারি ও ভিন্নমতের ওপর দমনপীড়ন চালাতে তাদের সুবিধা হয়।

​দলের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি হলের স্বাভাবিক পরিবেশকে কীভাবে গ্রাস করে, তার একটি বিশদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে নিবন্ধটিতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ​সিট বাণিজ্য ও জোরপূর্বক মিছিল: হলের সিট দখল ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক মিছিলে অংশ নিতে বাধ্য করা।
  • ​সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা: বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ, নিয়মিত চিৎকার-চেঁচামেচি, রাজনৈতিক আড্ডা, অস্ত্র ও মাদকের ছড়াছড়ি এবং পড়াশোনার পরিবেশ ধ্বংস হওয়া।
  • ​নিপীড়ন ও গেস্টরুম সংস্কৃতি: গেস্টরুমে র‍্যাগিং, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, বাড়িতে থেকে পাঠানো খাবারের ভাগ নেওয়া এবং নেতার অনুমতি ছাড়া চলাফেরা করতে না দেওয়া।
  • ​প্রশাসনের জিম্মি দশা: ডাইনিং ও ক্যান্টিন নিয়ন্ত্রণ এবং হলের প্রভোস্ট ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাখা। সামান্য নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে শারীরিক নির্যাতন বা জীবননাশের হুমকি দেওয়া।

​শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে দলীয় ছাত্রনেতারা ক্ষমতার যে অপব্যবহার করেন, তার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে এভাবে—

  • ​বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে প্রভাব বিস্তার।
  • ​বিভিন্ন টেন্ডার, সাপ্লাই, ছাত্র ভর্তি এবং গবেষণা ও স্কলারশিপ নিয়ন্ত্রণ।
  • ​শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে ক্যাম্পাসগুলোতে হানাহানি, সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির মতো ঘটনা।

​বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে নিবন্ধে বলা হয়, বহু রক্ত ও সংগ্রামের পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রশাসনকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য করেছে। তৎকালীন শাসকদল, তাদের ছাত্রসংগঠন এবং আজ্ঞাবহ মহলের নানা চাপ ও পরীক্ষা বন্ধের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা পিছু হটেনি। ফলস্বরূপ, বর্তমানে বুয়েটের হলগুলোতে কোনো দলীয় রাজনীতি নেই, রয়েছে শুধু নিরাপদ ‘ব্রাদারহুড’ বা পারস্পরিক সৌহার্দ্য।

​বুয়েটের একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা উদ্ধৃত করে রাজনীতিমুক্ত হলের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:

  • ​সহজে সিট প্রাপ্তি: কোনো তদবির বা রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়াই সাধারণ প্রক্রিয়ায় হলের সিট বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে।
  • ​র‍্যাগিংয়ের পরিবর্তে স্নেহের পরশ: জুনিয়রদের ওপর কোনো নির্যাতন নেই; বরং সিনিয়ররা নিয়মিত তাদের পড়াশোনা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ নিচ্ছেন।
  • ​নিরাপদ ও আন্তরিক পরিবেশ: ডাইনিংয়ে পরিচিত হওয়া, ছোটখাটো উপহার দেওয়া-নেওয়া এবং অসুস্থ রুমমেটদের নিঃস্বার্থ সেবাযত্নের মাধ্যমে হলগুলো এখন শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সুন্দর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।

​

অধ্যাপক আ ফ ম রাজিবুল আলম ইভান তার নিবন্ধের শেষাংশে বলেন, হীনস্বার্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের লীলা খেলায় মেতে না তুলে আসুন আমরা সকলে মিলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চিরতরে বন্ধের বিষয়ে সোচ্চার হই। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার না হয়ে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়—এটাই জাতির মূল প্রত্যাশা।