১১:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তোলা ছবি প্রকাশ: ‘পৃথিবীর অস্ত যাওয়া’ ও সূর্যগ্রহণে মুগ্ধ নাসার নভোচারীরা

অন্যদেশ ডেস্ক
  • আপডেট : ০১:১৪:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৯২ বার দেখা হয়েছে

চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ধারণ করা দৃষ্টিনন্দন কিছু ছবি প্রকাশ করেছে নাসা। আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা এসব ছবি তুলেছেন, যা মহাকাশ গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রকাশিত ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি ‘Earthset-আর্থসেট’ (পৃথিবীর অস্ত যাওয়া) দৃশ্য। এতে দেখা যায়, গহ্বর ও উঁচুনিচু চাঁদের পৃষ্ঠের ওপারে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে নীলাভ পৃথিবী। অসীম মহাকাশের অন্ধকারে ছোট্ট, উজ্জ্বল এই গ্রহটি মানবজাতির অস্তিত্ব ও ভঙ্গুরতার এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছে।

NASA Image of Earthset poking out over the surface of the moon

পৃথিবীর অস্ত যাওয়া, যাকে বলা হচ্ছে আর্থ সেট (Earthset)। -ছবি: নাসা

নাসা জানায়, ছবিটি ওরিয়ন মহাকাশযানের জানালা দিয়ে তোলা হয় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটে। ছবিতে পৃথিবীর একাংশে রাতের অন্ধকার, আর আলোকিত অংশে অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ওপর ঘূর্ণায়মান মেঘের স্তর স্পষ্ট দেখা যায়। সামনে দেখা যায় ‘Ohm crater’ (ওহম ক্রেটার) নামের একটি জটিল গহ্বর, যার ধাপবিশিষ্ট প্রান্ত এবং মাঝখানে উঁচু অংশ রয়েছে—যা চাঁদের পৃষ্ঠে শক্তিশালী আঘাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।

আরেকটি ছবিতে ধরা পড়েছে এক মনোমুগ্ধকর সূর্যগ্রহণের দৃশ্য। এতে দেখা যায়, চাঁদ পুরোপুরি সূর্যকে আড়াল করে রেখেছে এবং চারপাশে সূর্যের উজ্জ্বল করোনা ছড়িয়ে আছে। পৃথিবী থেকে সূর্যগ্রহণ সাধারণত কয়েক মিনিট স্থায়ী হলেও, চাঁদের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে নভোচারীরা প্রায় ৫৪ মিনিট ধরে পূর্ণ গ্রহণ উপভোগ করার সুযোগ পান—যা এক বিরল অভিজ্ঞতা।

NASA The sun shining behind the blocked out moon

সূর্যগ্রহণ। চাঁদ পুরোপুরি ঢেকে ফেলেছে সূর্যকে। ছবি: নাসা

এই দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover) বলেন, এটি ‘বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো’ এবং ‘অবিশ্বাস্য’। তার ভাষায়, সূর্য চাঁদের আড়ালে চলে গেলেও করোনার আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চাঁদের চারপাশে এক আলোকবলয় তৈরি করে। একই সঙ্গে দূরে উজ্জ্বল পৃথিবী এবং সামনে ভাসমান চাঁদ—এই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

NASA Dark outline of the Moon with the glow of the Sun from behind and Venus as a bright spot in the bottom left hand corner

ছবিতে চাঁদের এক পাশে উজ্জ্বল একটি বিন্দু দেখা যায়, যা হলো ভেনাস (Venus) গ্রহ।

নাসা আরও জানায়, এই ফ্লাইবাইটি মোট ছয় ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। এর একটি অংশে মহাকাশযান চাঁদের আড়ালে চলে যাওয়ায় পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা ‘রেডিও সাইলেন্স’ নামে পরিচিত। এ সময় নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের দূরবর্তী অংশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।

NASA Cratered surface of the Moon

নাসা চাঁদের পৃষ্ঠের এই ছবিটিকে ‘কাছ থেকে দেখার জন্য প্রস্তুত’ নামে অভিহিত করেছে।- ছবি: নাসা

১৯৭২ সালে শেষ মানব মিশনের পর থেকে চাঁদের ওই অংশে কেবল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এবারের মিশনে নভোচারীরা নিজ চোখে সেই অংশ দেখেছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা অডিও আকারে রেকর্ড করেছেন। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এসব বর্ণনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া যাবে।

NASA Earth peaking out from behind the Moon

ওরিয়ন মহাকাশযানের নভোচারীদের তোলা ‘পৃথিবীর উদয় (Earthrise)’ দৃশ্য। -ছবি: নাসা

উল্লেখ্য, এই আর্থসেট দৃশ্য ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো-৮ (Apollo 8) মিশনের সময় নভোচারী বিল অ্যান্ডার্স-এর (Bill Anders) তোলা বিখ্যাত ‘Earthrise’ (আর্থরাইজ) ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই ছবিটি এখনো মহাকাশ ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী ও প্রভাবশালী ছবি হিসেবে বিবেচিত।

 

মিশনের শেষ দিকে নভোচারীরা আর্থরাইজ  (Earthrise) দৃশ্যও ধারণ করেন—যেখানে চাঁদের আড়াল থেকে আবার ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয় পৃথিবী। এই পুরো যাত্রা শুধু বৈজ্ঞানিক দিক থেকেই নয়, মানবিক অনুভূতির দিক থেকেও এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে নাসা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তোলা ছবি প্রকাশ: ‘পৃথিবীর অস্ত যাওয়া’ ও সূর্যগ্রহণে মুগ্ধ নাসার নভোচারীরা

আপডেট : ০১:১৪:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ধারণ করা দৃষ্টিনন্দন কিছু ছবি প্রকাশ করেছে নাসা। আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা এসব ছবি তুলেছেন, যা মহাকাশ গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রকাশিত ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি ‘Earthset-আর্থসেট’ (পৃথিবীর অস্ত যাওয়া) দৃশ্য। এতে দেখা যায়, গহ্বর ও উঁচুনিচু চাঁদের পৃষ্ঠের ওপারে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে নীলাভ পৃথিবী। অসীম মহাকাশের অন্ধকারে ছোট্ট, উজ্জ্বল এই গ্রহটি মানবজাতির অস্তিত্ব ও ভঙ্গুরতার এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছে।

NASA Image of Earthset poking out over the surface of the moon

পৃথিবীর অস্ত যাওয়া, যাকে বলা হচ্ছে আর্থ সেট (Earthset)। -ছবি: নাসা

নাসা জানায়, ছবিটি ওরিয়ন মহাকাশযানের জানালা দিয়ে তোলা হয় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটে। ছবিতে পৃথিবীর একাংশে রাতের অন্ধকার, আর আলোকিত অংশে অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ওপর ঘূর্ণায়মান মেঘের স্তর স্পষ্ট দেখা যায়। সামনে দেখা যায় ‘Ohm crater’ (ওহম ক্রেটার) নামের একটি জটিল গহ্বর, যার ধাপবিশিষ্ট প্রান্ত এবং মাঝখানে উঁচু অংশ রয়েছে—যা চাঁদের পৃষ্ঠে শক্তিশালী আঘাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।

আরেকটি ছবিতে ধরা পড়েছে এক মনোমুগ্ধকর সূর্যগ্রহণের দৃশ্য। এতে দেখা যায়, চাঁদ পুরোপুরি সূর্যকে আড়াল করে রেখেছে এবং চারপাশে সূর্যের উজ্জ্বল করোনা ছড়িয়ে আছে। পৃথিবী থেকে সূর্যগ্রহণ সাধারণত কয়েক মিনিট স্থায়ী হলেও, চাঁদের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে নভোচারীরা প্রায় ৫৪ মিনিট ধরে পূর্ণ গ্রহণ উপভোগ করার সুযোগ পান—যা এক বিরল অভিজ্ঞতা।

NASA The sun shining behind the blocked out moon

সূর্যগ্রহণ। চাঁদ পুরোপুরি ঢেকে ফেলেছে সূর্যকে। ছবি: নাসা

এই দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover) বলেন, এটি ‘বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো’ এবং ‘অবিশ্বাস্য’। তার ভাষায়, সূর্য চাঁদের আড়ালে চলে গেলেও করোনার আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চাঁদের চারপাশে এক আলোকবলয় তৈরি করে। একই সঙ্গে দূরে উজ্জ্বল পৃথিবী এবং সামনে ভাসমান চাঁদ—এই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

NASA Dark outline of the Moon with the glow of the Sun from behind and Venus as a bright spot in the bottom left hand corner

ছবিতে চাঁদের এক পাশে উজ্জ্বল একটি বিন্দু দেখা যায়, যা হলো ভেনাস (Venus) গ্রহ।

নাসা আরও জানায়, এই ফ্লাইবাইটি মোট ছয় ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। এর একটি অংশে মহাকাশযান চাঁদের আড়ালে চলে যাওয়ায় পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা ‘রেডিও সাইলেন্স’ নামে পরিচিত। এ সময় নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের দূরবর্তী অংশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।

NASA Cratered surface of the Moon

নাসা চাঁদের পৃষ্ঠের এই ছবিটিকে ‘কাছ থেকে দেখার জন্য প্রস্তুত’ নামে অভিহিত করেছে।- ছবি: নাসা

১৯৭২ সালে শেষ মানব মিশনের পর থেকে চাঁদের ওই অংশে কেবল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এবারের মিশনে নভোচারীরা নিজ চোখে সেই অংশ দেখেছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা অডিও আকারে রেকর্ড করেছেন। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এসব বর্ণনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া যাবে।

NASA Earth peaking out from behind the Moon

ওরিয়ন মহাকাশযানের নভোচারীদের তোলা ‘পৃথিবীর উদয় (Earthrise)’ দৃশ্য। -ছবি: নাসা

উল্লেখ্য, এই আর্থসেট দৃশ্য ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো-৮ (Apollo 8) মিশনের সময় নভোচারী বিল অ্যান্ডার্স-এর (Bill Anders) তোলা বিখ্যাত ‘Earthrise’ (আর্থরাইজ) ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই ছবিটি এখনো মহাকাশ ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী ও প্রভাবশালী ছবি হিসেবে বিবেচিত।

 

মিশনের শেষ দিকে নভোচারীরা আর্থরাইজ  (Earthrise) দৃশ্যও ধারণ করেন—যেখানে চাঁদের আড়াল থেকে আবার ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয় পৃথিবী। এই পুরো যাত্রা শুধু বৈজ্ঞানিক দিক থেকেই নয়, মানবিক অনুভূতির দিক থেকেও এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে নাসা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি