ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের শিক্ষকদের রমরমা কোচিং-বাণিজ্য
- আপডেট : ০১:৫১:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫
- / ২৬৯৪ বার দেখা হয়েছে
ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে যে সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করানোর কথা, সে সময় কোচিংয়ে সময় দিচ্ছেন শিক্ষকেরা। আর এই কোচিংয়ের রমরমা বাণিজ্য করে যাচ্ছেন ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের কয়েকজন শিক্ষক। এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষকের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

অভিযোগ আছে, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের কয়েকজন শিক্ষক এই কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত। তারা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করিয়ে কোচিংয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সরেজমিনে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গেলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এ-সংক্রান্ত ভিডিও চিত্র ও তথ্যপ্রমাণ দৈনিক অন্যদেশ প্রতিনিধির কাছে রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তারা হলেন পদার্থবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান প্রভাষক শাহরিয়ার আহমেদ (৪০তম বিসিএস, সাধারণ শিক্ষা), হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক (৪০তম বিসিএস, সাধারণ শিক্ষা) মোঃ সাদ্দাম হোসেন, ও প্রভাষক মোঃ মেহেদী হাসান (৪৩তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা)। তাদের মধ্যে মোঃ শাহরিয়ার আহমেদ বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে থেকে কলেজ চলাকালীন কীভাবে কোচিংয়ে সময় দেন, কলেজের অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে প্রত্যেক শিক্ষককেই নিষেধ করা আছে।
অভিযোগ আছে, শিক্ষকদের এই কোচিং বাণিজ্যে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অফিস সহকারী আব্দুল আউয়াল।
অভিযোগের ব্যাপারে সরেজমিনে জানতে গেলে এর সত্যতা মেলে। ১৬ অক্টোবর বেলা পৌনে একটার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের সামনের একটি ভবনে অভিযুক্ত শিক্ষকদের কোচিং করাতে দেখা যায়। কোচিং করানোর ভিডিও চিত্র দৈনিক অন্যদেশ প্রতিনিধির কাছে রয়েছে। এ সময় শিক্ষকরা কোচিং করানোর কথা ও ছাত্র-ছাত্রীরা কোচিং করার কথা স্বীকার করেন। তবে তারা জানান, শ্রেণিকক্ষে যখন কোনো পাঠদান থাকে না, তখনই তারা কোচিংয়ে সময় দিয়ে থাকেন। কলেজ চলাকালীন অন্য কোথাও পাঠদান করা যায় না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তারা অবগত।

এ ব্যাপারে ১৬ অক্টোবর বেলা একটার দিকে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেনের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়। কলেজ চলাকালে কোনো শিক্ষক অন্য কোথাও কোচিং করাতে পারেন কি না, জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, কলেজের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা। এ সময় কোনো শিক্ষকই নিজ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যতীত অন্য কোথাও পাঠদান করাতে পারবেন না।
এ সময় তিন শিক্ষকের নিজ শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বাইরে কলেজ চলাকালীন অন্য কোথাও কোচিং করানোর বিষয়টি তোলা হলে তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন দৈনিক অন্যদেশ প্রতিনিধি মুঠোফোনে ধারণকৃত স্বীকার করা কোচিং করানোর সময় উল্লেখ করা অডিও কল রেকর্ড শোনালে তিনি সরেজমিন তিন শিক্ষকের কর্মকাণ্ড দেখতে যান। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন শিক্ষকদের কোচিংয়ে পাঠদানের সত্যতা পান। এ সময় সেখানে কোচিং করাচ্ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহরিয়ার আহমেদ। শিক্ষক শাহরিয়ার আহমেদ কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, কলেজের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত হলেও তার ক্লাসের শিডিউল না থাকায় কোচিংয়ে এসে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদানে সময় দিচ্ছি বলে উল্লেখ করেন। কলেজ চলাকালীন কলেজের বাইরে কোনো কোচিংয়ে পাঠদানকাজে সময় দিতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি বা কোনো শিক্ষকই এই ধরনের কাজের সাথে জড়িত থাকতে পারেন না। এ সময় সঙ্গে থাকা কলেজের অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন বলেন, আমার পক্ষ থেকে সব শিক্ষককেই নিষেধ করা হয়েছে কলেজ চলাকালীন কোচিংয়ে পাঠদান থেকে বিরত থাকতে। পাঠদানের শিক্ষক ভুল স্বীকার করে বলেন, এটা আমাদের ভুল হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের কোচিং ব্যবসা বন্ধের প্রণীত আইনের ২০১২ সালের আইনে ৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক তার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না। ১৪ নং অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক কোনো কোচিং বাণিজ্যে যুক্ত থাকলে তার এমপিও স্থগিত, বাতিল, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্ত ইত্যাদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নীতিমালায় বলা হয়, কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকার পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি, স্বীকৃতি ও অধিভুক্তি বাতিল করতে পারবে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী বিধিমালার অধীনে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।












